একদিনের সরকারি সফরে চুয়াডাঙ্গা ঘুরে গেলেন চুয়াডাঙ্গার সাবেক জনপ্রিয় জেলা প্রশাসক ভূমি মন্ত্রনালয়ের অতিরিক্ত সচিব জিয়াউদ্দীন আহমেদ। পুরানো স্মৃতি রোমন্থন করে চুয়াডাঙ্গার মাটিতে নিজের হাতে গোড়া পত্তন করা বেশ কিছু উন্নয়ন কাজের পাশে দাঁড়িয়ে চোখের পানি ফেললেন নিরবে।
কোন এক বৃক্ষ প্রেমী মানুষ বলেছিলেন" যিনি গাছ লাগান তিনিই গাছের,দুঃখ,কষ্ঠ, যাতনা বোঝেন। গাছকে কিভাবে যত্ন করে মহিরুহের আকার ধারণ করাতে হয় সেটিও তিনি জানেন "। বৃক্ষ প্রেমীও বৃক্ষ বিশ্লেষক কাশতকার বলেছেন, "আধুনিক বিশ্বে যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুরা যখন অমানুষিকভাবে বোমা ফেলতে থাকে-তখন আপনার জন্য সেই পুরানো বন্ধুর আশ্রয়ে যাওয়াই শ্রেয় -সে বন্ধু হলো বৃক্ষবন্ধু, যে কোনদিন প্রতিবাদ না করেই চিরকাল আপনার খেদমত করে যাচ্ছে"।
চুয়াডাঙ্গায় জেলা প্রশাসক থাকাকালীন জিয়াউদ্দীন আহমেদ পরিবেশ উন্নয়নে বৃক্ষরোপণ, অবকাঠামো নির্মাণ, উন্নয়ন, খেলা-ধুলার উন্নয়ন,সৌন্দর্য বৃদ্ধি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণ সহ জেলার উন্নয়নে নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। একদিনে ৭ লক্ষ তাল বীজের চারা রোপন করে যেমন রেকর্ড করেছিলেন, তেমনি চুয়াডাঙ্গা কালেক্টরেট স্কুল এন্ড কলেজ প্রতিষ্ঠা, নিজ হাতে রাস্তার পাশের ঝোপঝাড় পরিষ্কার,খেলার মাঠের ক্ষতিকর পেরেকসহ অন্যান্য আবর্জনা পরিষ্কার,নদীতে পেতে রাখা কোমর তুলে নদীর গতিপথ স্বাভাবিক করা, খাদ্যদ্রব্যে ভেজাল বিরোধী কঠোর অভিযান,চুয়াডাঙ্গার ব্যান্ডিং ব্ল্যাক বেঙ্গল গোটের উন্নয়ন, চুয়াডাঙ্গার শিশু-কিশোর সাঁতার প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের ফান্ডগঠনে উদ্যোগ গ্রহণ,ডিসি ইকো পার্কের সৌন্দর্য্য বৃদ্ধিতে নানামুখী পদক্ষেপ, জেলা শহরের বাসিন্দাদের বিনোদনের জন্য একটি পার্ক নির্মাণের বিষয়ে উদ্যোগ, টপ সয়েল (অবৈধ বালী উত্তোলন), বিনষ্টকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ,তৎকালীন ডিসিস সম্মেলনে চুয়াডাঙ্গার উন্নয়নমূলক কথা তুলে ধরে দেওয়া ঝাঁঝালো বক্তব্য সহ বাংলাদেশের ইতিহাসে বেশি দর্শক উপস্থিতিতে চুয়াডাঙ্গা ডিসি গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টের আয়োজন স্মরণীয় করে রাখবে চুয়াডাঙ্গার তৎকালীন এ জেলা প্রশাসক জিয়াউদ্দীন আহমেদকে। গত ১০ নভেম্বর সরকারি সফরে ভূমি মন্ত্রণালয়ের "জনবান্ধব ভূমি সেবা ও জরিপ কার্যক্রমে মাঠ প্রশাসনের ভুমিকা" শীর্ষক কর্মশালায় যোগ দিতে আসেন চুয়াডাঙ্গায়। চুয়াডাঙ্গা জেলার সাবেক সফল এই ডিসি জিয়াউদ্দীন আহমেদ ১বছর ৭ মাস (১১/০৫/২০১৭ হতে- ১০/১০/২০১৮)জেলা প্রশাসক হিসেবে এ জেলায় দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তিনি যেদিন চুয়াডাঙ্গা থেকে বদলি আদেশে মন্ত্রণালয়ের উদ্দেশ্যে রওনা দেন তার প্রায় ২০ দিন আগে থেকে চুয়াডাঙ্গার সকল সরকারি বেসরকারি দপ্তর, সামাজিক- সাংস্কৃতিক সংগঠন, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিকসহ আপামর জনসাধারণের ফুলেল শুভেচ্ছা ও উপঢৌকনের ভারে ভারাক্রান্ত হয়ে পড়েন এই সফল জেলা প্রশাসক । তিনি যেদিন সপরিবারে ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন, সেদিন রাস্তার দু'পাশে চুয়াডাঙ্গার সাধারণ মানুষ ফুল নিয়ে শহরের প্রধান সড়ক,শহরের অলি -গলি, কোট মোড়, শহীদ হাসান চত্বর মোড়, একাডেমি মোড় সহ সকল মোড়ে মোড়ে অশ্রু সজল চোখে ফুলের বন্যায় ভাসিয়ে থাকে বিদায় দেন ।
দীর্ঘদিন পরে সরকারি সফরে ১ দিনের জন্য চুয়াডাঙ্গায় এসে এখানে জেলা প্রশাসক থাকাকালীন সেই পুরানো স্মৃতি রোমন্থন করে সেগুলো যেন হাতড়িয়ে হাতড়িয়ে খুঁজছিলেন। অনেকটা দিক-বিদিক হয়ে ঘুরে ঘুরে দেখছিলেন তার হাতের স্পর্শ লেগে যে উন্নয়নের গোড়াপত্তন হয়েছিল সেই সকল স্মৃতি জায়গাগুলো। অনেক যত্ন ও শখের তৈরি জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের দো-তালার ছাদ বাগান, ৩য় তালার সবজি বাগান, ড্রামে তৈরি বিদেশি লম্বু কলা, শাপলা পুকুর, মাছ শিকারি বক, গ্যাসের সাহায্যে বাঁচিয়ে রাখা মাছগুলি, ছাদে তৈরি কলাবাগান, সু-শোভিত ফুলবাগান,বাউ কুলের বাগান,নতুন করে অঙ্কিত ব্যাডমিন্টন কোর্ট, অফিসার্স ক্লাব, জেলা প্রশাসকের বাংলো বাড়িতে দেশি-বিদেশি ফুল,হরিণের ঘর, বিভিন্ন প্রজাতির কবুতর পালনের স্মৃতি কথা সবই যেন জিয়াউদ্দীনের মানসপটে এতদিন জাগ্রত ছিল ।
এ জেলায় জেলা প্রশাসক থাকাকালীন দিনব্যাপী সরকারি ও সামাজিক দায়িত্ব পালন শেষে কর্ম ক্লান্ত হয়ে নিজ উদ্যোগে তৈরি ছাদ বাগানে এসে বাঙালী কৃষকের আদলে নির্মিত পরিপার্টি খড়ের ছাউনি তলায় বসে উপভোগ করতেন আবহমান বাংলার রুপ, রস ও সৌন্দর্যের গন্ধ। ছাদ বাগানের সেই গোল চত্বর ছাউনীর কথাও তিনি ভোলেননি। অশ্রু সজল চোখে এখানে বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে তিনি মনে মনে কি যেন ভাবছিলেন। হয়তোবা জেলা প্রশাসক হিসেবে চুয়াডাঙ্গায় ফেলে যাওয়া সেই দিনগুলির কথা? সে সময় এ জেলার মানুষগুলোকে কত কাছ থেকে দেখেছে তার সৃষ্টিশীল চোখ। জেলা বাসীর উন্নয়নে চেষ্টা করেছেন প্রাণপণ।
এসব কথা ভাবতে ভাবতেই কিছুটা নিজেকে সামলে নিয়ে চুয়াডাঙ্গায় থাকাকালীন সেই সময়কার যে সকল কর্মচারী এখনো জেলা প্রশাসনে কর্মরত শাহিলুল্লাহ কয়েন, শহিদুল ইসলাম,নজরুল ইসলাম, আশরাফুল,ক্রীড়া সংগঠক হিসাবে ইসলাম রকিব, পিন্টু অনেকের নামই যেন মুখস্ত বলে গেলেন। খোঁজ নিলেন এ সকল ক্রীড়া সংগঠক, কর্মচারী- কর্মকর্তাদের বর্তমান অবস্থার। সে সময়ে জেলা প্রশাসন চত্বরের পরিত্যাক্ত একটি টিনের মোটর গ্যারেজের উপর ঝুঁকিপূর্ণ একটি মেহগনি গাছ ছিল। সেটি সেই সময়ে কেটে ফেলার বন্দোবস্তও হয়েছিল। কিন্তু সে সময়ে সেটি অপসারণ করা সম্ভব হয়েছিল না। সেটির কথাও তিনি বর্তমান জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জহিরুল ইসলামের পাশে দাঁড়িয়েই উপস্থিত কর্মচারীদের উদ্দেশ্যে বললেন, সেই গাছটি কি অপসারণ করা হয়েছে? এ সময় উপস্থিত কর্মচারীরা বললেন, না স্যার নানা জটিলতার কারণে সেই ঝুঁকিপূর্ণ গাছটি অপসারণ করা হয়নি, সে অবস্থাতেই আছে!

এরপর জিয়াউদ্দীন আহমেদ ছাদবাগানে বেশ কিছু সময় পায়চারি করে বর্তমান জেলা প্রশাসকের নিকট চুয়াডাঙ্গা শিশু কিশোর সাঁতার প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের খোঁজ-খবর নিয়ে কি যেন ভেবে ছাদ বাগান থেকে বেরিয়ে চলে চলে গেলেন বর্তমান জেলা প্রশাসকের জেলা কার্যালয়ের দিকে। সে সময় বলছিলেন বিকাল ৪টায় কুষ্টিয়ার উদ্দেশ্যে আমাকে যেতে হবে। তিনি হয়তো মনের অজান্তেই চুয়াডাঙ্গা বাসীর উদ্দেশ্যে বলছিলেন, মোর পরিচয় এই হোক, আমি তোমাদেরই লোক!
উল্লেখ্য চুয়াডাঙ্গার সাবেক এই সফল জেলা প্রশাসক জিয়াউদ্দীন আহমেদ বর্তমানে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের ভূমি মন্ত্রণালয়ে ( এনডিসি) অতিরিক্ত সচিব ( উন্নয়ন) হিসাবে কর্মরত আছেন।