
জামালপুর জেলার ইসলামপুরে চিনাডুলী ফাজিল ডিগ্রি মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ইব্রাহীম খলিলুল্লাহর বিরুদ্ধে শিক্ষক নিয়োগ, বাণিজ্য, অর্থ আত্মসাৎ এবং ক্ষমতার অপব্যবহারসহ নানা ধরনের দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
এই অভিযোগগুলো স্থানীয় শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং এলাকাবাসীদের মধ্যে ব্যাপক ক্রোধের সৃষ্টি করেছে, যার প্রতিক্রিয়ায় সোমবার (৭ অক্টোবর) মাদ্রাসা মাঠে মানববন্ধনের আয়োজন করা হয়েছে।
অর্থ আত্মসাত ও হিসাবহীনতা
অত্র মাদ্রাসার সহকারী শিক্ষক মাওলানা মামুনুর রশীদ জানান, ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ থাকাকালে ফরম ফিলাপ ও রেজিস্ট্রেশন বাবদ ২৪ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, অন্যান্য আয়-ব্যয়ের হিসাবও অধ্যক্ষ প্রদান করেননি, যার ফলে মাদ্রাসার অর্থনৈতিক অবস্থার স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাচ্ছে না। মামুনুর রশীদ উল্লেখ করেন, মাদ্রাসার নিয়মিত খরচ ও আয়-ব্যয়ের হিসাবপত্র প্রকাশ না করা একটি বড় ধরনের অনিয়ম এবং স্বচ্ছতার অভাব নির্দেশ করে।
অধ্যক্ষের অবহেলা ও যোগাযোগের অসুবিধা
অধ্যক্ষ ইব্রাহীম খলিলুল্লাহর সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর ফোন বন্ধ পাওয়া যায়, যা স্থানীয়দের মধ্যে সন্দেহের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে যে, অধ্যক্ষ নিজের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আসার সম্ভাবনা থাকলে তিনি বিষয়টি লুকানোর চেষ্টা করছেন। এছাড়াও, তিনি মাদ্রাসার কার্যক্রমে পর্যাপ্ত মনোযোগ না দিয়ে নিজের ব্যক্তিগত কাজে ব্যস্ত থাকেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
মানববন্ধনের আয়োজন ও স্থানীয় প্রতিক্রিয়া:
সোমবার মাদ্রাসা মাঠে অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে স্থানীয় শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং এলাকার বাসিন্দারা অংশগ্রহণ করেছেন। মানববন্ধন চলাকালীন, অংশগ্রহণকারীরা অধ্যক্ষের অব্যাহত অনিয়ম এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছেন।
মানববন্ধনের শিরোনামে তাঁরা লিখেছেন, “দুর্নীতি-মুক্ত মাদ্রাসার অধিকার আমাদের”, এবং একটি সাদা পতাকা উত্তোলন করে অবস্থান নেয়ার মাধ্যমে তাদের দাবি জোরদার করেছেন।
মানুষের এই আন্দোলন মাদ্রাসার অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থার উপর গুরুত্বারোপ করেছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি দ্রুত সমাধানের আহ্বান জানানো হয়েছে।
স্থানীয় নেতারা বলেন, যদি মাদ্রাসার প্রশাসন সুষ্ঠু ব্যবস্থা না নেয়, তবে এই ধরনের আন্দোলন আরো ব্যাপকভাবে প্রসারিত হতে পারে।
সামাজিক ও ধর্মীয় প্রেক্ষাপট
চিনাডুলী ফাজিল মাদ্রাসা স্থানীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। এখানে শিক্ষার্থীরা ইসলামী শিক্ষা সহ সাধারণ শিক্ষাও লাভ করে থাকে। মাদ্রাসার সুষ্ঠু পরিচালনা নিশ্চিত করা শুধুমাত্র শিক্ষার্থীদের জন্যই নয়, পুরো সম্প্রদায়ের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। দুর্নীতি ও অনিয়ম মাদ্রাসার সুনামহানি করে এবং শিক্ষার্থীদের নৈতিক শিক্ষার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
সম্প্রতি, ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এই ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ বেড়েই যাচ্ছে, যা সমাজে একটি চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বচ্ছতা এবং নৈতিকতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি, কারণ এগুলো সমাজের মৌলিক নৈতিক ভিত্তি গড়ে তোলে।
সমাধানের পথে পদক্ষেপ:
স্থানীয় নেতারা এবং মাদ্রাসার শিক্ষকেরা যৌথভাবে একটি কমিটি গঠন করার প্রস্তাব দিয়েছেন, যা মাদ্রাসার অভ্যন্তরীণ তদন্ত করবে এবং সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। এছাড়াও, এনটিআরসিএ সহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি ত্বরান্বিতভাবে দেখার আহ্বান জানানো হয়েছে।
মাদ্রাসার শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা আশা করছেন, এই আন্দোলনের মাধ্যমে মাদ্রাসার প্রশাসন পুনরুদ্ধার করা যাবে এবং শিক্ষার্থীরা একটি সুষ্ঠু ও নিরাপদ শিক্ষাব্যবস্থা পাবে। তারা আরও দাবি করেছেন, মাদ্রাসার সকল কর্মচারী ও শিক্ষকের সুষ্ঠু নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে এবং অর্থনৈতিক হিসাবপত্রের স্বচ্ছতা বজায় রাখতে হবে।
উপসংহার:
চিনাডুলী ফাজিল মাদ্রাসার বর্তমান পরিস্থিতি একদিকে যেমন উদ্বেগের কারণ, অন্যদিকে এটি মাদ্রাসা প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতার প্রয়োজনীয়তাকে তুলে ধরে। স্থানীয় জনগণ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যৌথ প্রচেষ্টায় আশা করা যায়, মাদ্রাসার বর্তমান সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধান হবে এবং শিক্ষার্থীরা একটি সুন্দর ও সুষ্ঠু শিক্ষাব্যবস্থার উপভোগ করতে পারবেন।










