শেখ হাসিনার প্রধানমন্ত্রীত্ব দাবি এবং ড. ইউনুস সরকারের আইনগত বৈধতা: আইনী পর্যালোচনা
Spread the love

ইদানিং একটি বিষয় আলোচনায় উঠে এসেছে যে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যথাযথ প্রক্রিয়ায় পদত্যাগ না করায় তিনি এখনও দেশের প্রধানমন্ত্রী! সম্প্রতি শেখ হাসিনা’র একটি ফোন কলের অডিও প্রকাশ পেয়েছে। উক্ত ফোনকলে তিনি দাবি করেছেন তার পদত্যাগটি যথাযথ আইনী প্রকৃয়ায় হয়নি। তিনি রাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগ করেছেন সত্য; কিন্তু সংবিধানের ৫৭ অনুচ্ছেদের ব্যত্যয় ঘটেছে। এটা নিয়ে আবার কেউ কেউ প্রশ্ন তুলে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা করছেন। আরেকটি ভিডিও কলে শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘‘আমি দেশের কাছাকাছি আছি, যাতে চট করে ঢুকে যেতে পারি’’।

শেখ হাসিনার ফোনকলের সূত্র ধরে প্রশ্নটি আরও জোড়ালো হয়েছে শেখ হাসিনা কি আদৌ পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন? এবিষয়ে প্রথম প্রশ্ন তুলেছেন বিশিষ্ট কলামিস্ট ফরহাদ মজহার। এর আগে সজীব ওয়াজেদ জয় বলেছেন তার মা শেখ হাসিনাই এখনও প্রধানমন্ত্রী, আপনারা কেউ শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্র দেখেছেন?

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত এ বিষয়ে নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। যেহেতু আমরা আইনাঙ্গনের মানুষ সে হিসেবে আমাদের অনেক শুভাকাঙ্খী কৌতুহলবশত জানতে চাচ্ছেন, ফোন করছেন আসল ঘটনা কি। আইনের একজন ক্ষুদ্র শিক্ষার্থী হিসেবে এবং পেশাগত কাজে বাংলাদেশের সংবিধান নিয়ে আমাদের সম্যক চর্চা করতে হয়। সহজ ভাষায় আমাদের সংবিধান রচিত। বাংলা পড়তে পারেন-এমন মানুষ বোধ হয় অতি সহজেই এ বিষয়টি বুঝতে পারবেন।

আমাদের সংবিধানের ৫৭ অনুচ্ছেদে প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের প্রক্রিয়া সম্পর্কে বলা আছে। সেখানে বলা হয়েছে-
৫৭। (১) অনুসারে প্রধানমন্ত্রীর পদ শূন্য হইবে, যদি-
(ক) তিনি কোন সময়ে রাষ্ট্রপতির নিকট পদত্যাগপত্র প্রদান করেন; অথবা
(খ) তিনি সংসদ-সদস্য না থাকেন।
(২) সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থন হারাইলে প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করিবেন কিংবা সংসদ ভাংগিয়া দিবার জন্য লিখিতভাবে রাষ্ট্রপতিকে পরামর্শদান করিবেন এবং তিনি অনুরূপ পরামর্শদান করিলে রাষ্ট্রপতি, অন্য কোন সংসদ-সদস্য সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আস্থাভাজন নহেন এই মর্মে সন্তুষ্ট হইলে, সংসদ ভাংগিয়া দিবেন।
(৩) প্রধানমন্ত্রীর উত্তরাধিকারী কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীকে স্বীয় পদে বহাল থাকিতে এই অনুচ্ছেদের কোন কিছুই অযোগ্য করিবে না।

প্রিয় পাঠক একটু খেয়াল করুন, দেশ থেকে প্রধানমন্ত্রী পলায়ন করলে কিংবা পালিয়ে যেতে বাধ্য হলে কি হবে, সে বিষয়ে কিন্তু এখানে কিছুই বলা নেই। এক্ষেত্রে সমাধান হচ্ছে আমাদের সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ। আমরা একটু পর্যালোচনা করি এ বিষয়ে কী বলা আছে সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদে।

অনুচ্ছেদ-১০৬: যদি কোন সময়ে রাষ্ট্রপতির নিকট প্রতীয়মান হয় যে, আইনের এইরূপ কোন প্রশ্ন উত্থাপিত হইয়াছে বা উত্থাপনের সম্ভাবনা দেখা দিয়াছে, যাহা এমন ধরনের ও এমন জনগুরুত্বসম্পন্ন যে, সেই সম্পর্কে সুপ্রীম কোর্টের মতামত গ্রহণ করা প্রয়োজন, তাহা হইলে তিনি প্রশ্নটি আপীল বিভাগের বিবেচনার জন্য প্রেরণ করিতে পারিবেন এবং উক্ত বিভাগ স্বীয় বিবেচনায় উপযুক্ত শুনানীর পর প্রশ্নটি সম্পর্কে রাষ্ট্রপতিকে স্বীয় মতামত জ্ঞাপন করিতে পারিবেন।

পাঠক নিশ্চয় আপনাদের মনে আছে গত ৫ই আগস্ট ২০২৪ যখন ছাত্রজনতার তুমুল আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেলো তখন কিন্তু দেশে সাংবিধানিক সংকট তৈরি হলো। সেসময় ড. ইউনুসের নেতৃত্বে একটি অন্তবর্তীকালীন সরকার ক্ষমতাগ্রহনের আলোচনা চলছিলো এবং সেই সরকারের শপথ গ্রহনের দিনক্ষণও চূড়ান্ত হলো, তখন এইধরনের সরকার গঠন সঠিক হবে কি-না এ বিষয়ে মহামান্য রাষ্ট্রপতি সুপ্রিমকোর্টের মতামত চেয়ে পাঠান। তখন তৎকালীন প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে সুপ্রীম কোর্টের আপিল বিভাগ রাষ্ট্রপতিকে উপদেশমূলক মতামত প্রদান করেন যে, সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দেশের বর্তমান সাংবিধানিক সংকটকালীন সময়ে দেশ পরিচালনার জন্য অন্তবর্তীকালীন সরকার গঠন করা যেতে পারে । অর্থাৎ আমরা দেখতে পাচ্ছি ড. ইউনুসের নেতৃত্বে যে অন্তবর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়েছে তা আইনগতভাবেই হয়েছে। আর আইনে এটাকেই বলা হয়েছে Doctrine of necessity (সময়ের চাহিদা নীতি)।

প্রখ্যাত অস্ট্রিয়ান আইনজ্ঞ হেন্স কেলসনের এই নীতি অনুযায়ী, দেশে যদি কোন অনিবার্য পরিস্থিতি তৈরি হয়, সেক্ষেত্রে যে বা যারা ক্ষমতায় এসে দেশের স্থিতিশীলতা আনতে পারবেন তারাই বৈধ। এই নীতি অনুযায়ী এমনকি সামরিক শাসনকেও বৈধতা দেওয়া যায়। তাহলে উপরোক্ত আইনী পর্যালোচনা এবং সুপ্রীম কোর্টের উপদেশমূলক মতামতের ভিত্তিতে আমরা বলতে পারি ড. ইউনুসের বর্তমান অন্তবর্তীকালীন সরকার আইনগতভাবে সম্পূর্ণ বৈধ এবং শেখ হাসিনার এখনও নিজেকে প্রধানমন্ত্রী দাবি করার আইনগত কোনো ভিত্তি নেই। পুনশ্চ: আমাদের মহামান্য রাষ্ট্রপতি একজন সাবেক বিচারক। তিনি এসংক্রান্ত আইন বেশ ভালোভাবেই জানেন এবং বোঝেন। তিনি যদি সংবিধান লঙ্ঘন করে ড. ইউনুসকে শপথ পড়াতেন তাহলে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭(ক) অনুযায়ী রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধে অভিযুক্ত হতেন এবং এ অপরাধের একমাত্র শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। সুতরাং রাষ্ট্রপতি জেনে-বুঝে সংবিধান লঙ্ঘন করবেন এমনটা ভাবার কোনো সুযোগ নেই।

লেখক:
মুহাম্মদ ইকরামুল হক,
অ্যাডভোকেট, জজকোর্ট, চুয়াডাঙ্গা।
নির্বাহী সম্পাদক, এসএফ, টিভি।

সর্বশেষ খবর

Sat Sun Mon Tue Wed Thu Fri
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31