
চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সদস্য ৭০ এর অগ্নিসেনা বীর মুক্তিযোদ্ধা মঈনউদ্দীন পারভেজ তার নিজ বাসভবনে ইন্তেকাল করেছেন, ইন্নালিল্লাহি…. দীর্ঘদিন ফুসফুসে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে সোমবার একে জুলাই আনুমানিক
বেলা দুইটা ৪৫ মিনিটে দিকে কালিদাসপুরের নিজ বাসভবনে মৃত্যু বরণ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর। মৃত্যুকালে স্ত্রী ও সন্তান সহ অনেক গুনগান রেখে গেছেন। ১জুলাই সোমবার সন্ধ্যা ৬টায় রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় জাতীর শ্রেষ্ঠ সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধার মরম মইনুদ্দিন এর দাফন
কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
আলমডাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা স্নিগ্ধা দাস ও আলমডাঙ্গা থানার অফিসার ইনচার্জ শেখ গণি মিয়ার উপস্থিতিতে জেলা পুলিশের একটি চৌকস দল গার্ড অফ অনার প্রদান করেছেন।
গার্ড অব অনার শেষে জানাযা নামাজে উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন আলমডাঙ্গা উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আইয়ুব হোসেন,কালিসাদপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলহাজ শেখ আশাদুল হক মিকা, বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাড. আব্দুর রশিদ মোল্লা, সাবেক উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা শফিউর রহমান জোয়ার্দ্দার সুলতান, বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল কুদ্দুস, বীর মুক্তিযোদ্ধা আনসার আলী, বীর মুক্তিযোদ্ধা নওয়ার আলী নহর, বীর মুক্তিযোদ্ধা খন্দকার সেলিম হোসেন, বীর মুক্তিযোদ্ধা শ্রী মনিন্দ্রনাথ দত্ত, বীর মুক্তিযোদ্ধা মহি উদ্দিন, বীর মুক্তিযোদ্ধা আফজাল হোসেন, বীর মুক্তিযোদ্ধা রমজেত আলী, বীর মুক্তিযোদ্ধা খবির উদ্দিন, বীর মুক্তিযোদ্ধা ওয়াজেদ আলী মাস্টার, উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক ইয়াকুব আলী মাস্টার, উপজেলা আয়ামীলীগের সহসভাপতি আলহাজ¦ লিয়াকত আলী লিপু মোল্লা, বণিক সমিতির সভাপতি আরেফিন মিয়া মিলন, ক্যাশিয়ার আলাউদ্দিন, উপজেলা বিএনপি নেতা শেখ সাইফুল ইসলাম, উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি আক্তার জোয়ার্দ্দার, পৌর বিএনপির সভাপতি আজিজুল হক পিন্টু, সাধারন সম্পাদক জিল্লুর রহমান অল্টুসহ সকল দলের নেতাকর্মি, আত্মীয় স্বজন ও গ্রামের গণ্যমান্য ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন।
আলমডাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী অফিসার স্নিগ্ধা দাস। তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে লেখেন
কিছু মৃত্যু মেনে নেয়া যায় না। আমি কখনোই ভাবতে পারি নি আলমডাঙ্গায় থাকাকালীন ৭০ এর অগ্নিসেনা বীর মুক্তিযোদ্ধা মঈনুদ্দীন পারভেজ -এঁর মৃত্যুতে গার্ড অব অনার প্রদান করতে হবে। এত প্রাণোচ্ছ্বল, সাহসী আর স্পষ্টভাষী প্রশাসনবান্ধব মানুষ আজকাল খুব কমই দেখা যায়। যখনই দেখা হতো বলতেন, ” কখন কি হয় বলা যায় না, দোয়া কইরেন।” তিন-চারদিন আগেও প্রচন্ড অসুস্থ অবস্থায় আমার অফিসে এসেছিলেন। একটি কাজের জন্য অনুরোধ করেছিলেন। বলেছিলাম খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে তা করে দিব। হঠাৎ করেই ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মানসিকভাবে খুব ভেঙ্গে পড়েছিলেন। আজ বেলা ০৩.০০টার দিকে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুতে আলমডাঙ্গা উপজেলা প্রশাসন গভীরভাবে শোকাহত।
আগামী কোন মিটিং এ আর তিনি থাকবেন না! আগামী বিজয় দিবস আর স্বাধীনতা দিবসে সারারাত জেগে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন তদারকি করবেন না! এও কি ভাবা যায়…………
দিনশেষে একমাত্র মৃত্যুই ধ্রুব সত্য।
বেঁচে থাকার এই যে এত আয়োজন সবই মিথ্যা।
প্রসঙ্গত, ১৯৭০ সালে মঈনউদ্দিন মুক্তিযুদ্ধ থানায় ঢুকে পাকিস্তানি পতাকা পুড়িয়ে কারাগারে গিয়েছিলেন পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। পাকিস্তানি পতাকা পোড়ানোর কারণে স্থানীয়ভাবে তাকে ‘অগ্নিসেনা’ হিসেবে সংবর্ধনাও দেওয়া হয়। বেসরকারিভাবে ঢাকাতেও একাধিক সংস্থা তাকে সন্মাননা প্রদান করেছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ১৯৭১ সালে শুরু হলেও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মঈনউদ্দিনের যুদ্ধ শুরু হয় ১৯৭০ সালে। সেদিনের স্কুলছাত্র মঈনউদ্দিনের দুঃসাহসী কর্মকান্ড গল্পকাহিনিকেও হার মানায়।
১৯৭০ সালের মে মাসে চট্টগ্রামে শ্রমিক হত্যার প্রতিবাদে পূর্ব পাকিস্তানে শোক দিবস পালিত হচ্ছিল। কালো পতাকা উত্তোলন করা হয় বিভিন্ন স্থানে। সারাদেশে প্রতিবাদ শুরু হয়। পথে নামে ছাত্র-জনতাসহ নানা শ্রেণিপেশার মানুষ। চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা বহুমুখী বিদ্যালয় থেকেও একটি প্রতিবাদ মিছিল বের হয়। সেটি ৪ মে থেকে ৬ মে এর মধ্যে কোনো একদিন। মঈনউদ্দিন তখন মেট্রিক (এসএসসি) পরীক্ষার্থী ছিলেন। বিক্ষোভ মিছিলের সঙ্গে স্কুলের বাইরে বের হন মঈন উদ্দিন। রাস্তায় তখন অনেক মানুষ। দোকান বন্ধ করে ব্যবসায়ীরা নেমে এসেছেন। তখন অনেকের হাতেই ছিল কালো পতাকা। তার হাতেও একটি কালো পতাকা ছিল। বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি দপ্তরে কালো পতাকা তোলা হচ্ছিল। সেদিন মিছিলের সঙ্গে তিনিও আলমডাঙ্গা থানা চত্বরে ঢুকে পড়েন। সেখানে উড়ছিল পাকিস্তানি পতাকা।
তিনি চেয়েছিলেন পাকিস্তানি পতাকা অর্ধনমিত করে তার পাশে কালো পতাকা তুলে দিতে। একজন পুলিশ তাকে এ কাজে বাধা দেয়। তারও জেদ চেপে যায়। মাথা গরম হয়ে যায়। তিনি পাকিস্তানি পতাকা নামিয়ে পুড়িয়ে ফেললেন। এ জন্য তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা হয়। ২১ জুন রাত ২টায় পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়। ছয় মাস কারাগারে আটক থাকতে হয়েছিল। ১৮ ডিসেম্বর কুষ্টিয়া কারাগার থেকে মুক্তি পান তিনি। কিছুদিন পর মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি যুদ্ধে যোগ দেন। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আছে অনেক ঘটনা; অনেক স্মৃতি রয়েছে এই বীর মুক্তিযোদ্ধার। ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে ভারতের করিমপুর ক্যাম্পে গিয়েছিলেন। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নাম লেখান। পরে বেতাই ও আসামে যুদ্ধের ট্রেনিং নেন। বারাকপুরেও ছিলেন। সেখানে তোফায়েল আহমেদ ও নূরে আলম জিকুর অধীনে থেকেছেন। ভারতে মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং শেষ করে দেশে আসেন। কুষ্টিয়ার মিরপুরের মারফত আলীর নেতৃত্বে যুদ্ধে অংশ নেন। চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা ও কুষ্টিয়ার বিভিন্ন এলাকার যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। গুপ্তচর হিসেবেও কাজ করেছিলেন। যুদ্ধের স্মৃতিচারণে তিনি বলেছেন, গরু চরানোর রাখাল সেজে হানাদার বাহিনীর অবস্থান জেনেছেন। গুপ্তচরবৃত্তি করতে গিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে ধরাও পড়েছেন।
“তারা আমাকে রাখাল ভেবে চড় মেরে ছেড়ে দেয়। আমি হানাদার বাহিনীর ডেরা থেকে ফিরে আসি গোপন তথ্য নিয়ে, তাদের অবস্থান ও প্রস্তুতি জেনে। এসব তথ্য পরে যুদ্ধে কাজে লেগেছিল।”।
পাকিস্তানি পতাকা পোড়ানোর ঘটনায় দেশ স্বাধীন হলে তাঁকে ‘অগ্নিসেনা’ হিসেবে সংবর্ধনাও দেওয়া হয়।
তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন, একাধিক রাজনৈতিক পদ পদবী ছিল, রাজনৈতিক মহলে তার কোন কিছু চাহিদা ছিল না।
তার একটাই স্বপ্ন ছিল রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘অগ্নিসেনা’ উপাধি দেওয়া হয়।
আলমডাঙ্গা পৌরসভা ২০০৮ সালে ‘অগ্নিসেনা’ হিসেবে সংবর্ধনা দেয়া হয় , স্বর্ণপদকও দেয়। এরপর দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ও বেসরকারিভাবে ঢাকা থেকে ‘অগ্নিসেনা’ হিসেবে সংবর্ধিত হয়েছিলেন।
“অগ্নিসেনা হিসেবে মঈনউদ্দিন বিভিন্নভাবে সংবর্ধিত হয়েছেন। কিন্তু রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাননি। বীর মুক্তিযোদ্ধা মঈনউদ্দিনের বাবার নাম গঞ্জের আলী। বাড়ি চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার কালিদাসপুর গ্রামে। বাবার ছিল মুদি দোকানের ব্যবসা। ১৯৮৩ সালে বাবা মারা যান। সংসারের হাল ধরতে হয় তাকে। তিনি শেষ বয়সে পেশা হিসাবে ফার্নিচারের ব্যবসা করতেন। কালিদাসপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। সংসারে অভাব ছিল তার কিন্তু তিনি কখনওনআর্থিক সহায়তা চান নি । তার মনের আশা বলতে তিনি চেয়েছিলেন মৃত্যুর আগে তাকে যেন রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘অগ্নিসেনা’ উপাধি দেওয়া হয়।










