
এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলার স্বাধীনতা আনলে যারা আমরা তোমাদের ভুলবো না” ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে আত্মদানকারী বীর শহীদদের স্মরণে ঢাকা থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে সাভার থানার নবীনগরে জাতীয় স্মৃতিসৌধ অবস্থিত। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকে চিরস্মরণীয় করে রাখার জন্য ৮৪ একর জায়গার উপর প্রায় ৬৪ একর জুড়ে রয়েছে সবুজ ঘাসের বেষ্টনী এবং ৪০ একর জায়গা জুড়ে গড়ে উঠেছে জাতীয় স্মৃতিসৌধ। ১৯৭২ সালের ১৬ই ডিসেম্বর প্রথম বিজয় দিবসে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন।
স্থান নির্বাচন, রাস্তা নির্মাণ ও ভূমি উন্নয়নের পর স্থাপত্যের নকশা নির্বাচনের জন্য দেশজুড়ে শিল্পী, স্থপতি ও ভাস্করদের কাছ থেকে নকশা আহ্বান করা হয়। ১৯৭৮ সালের জুন মাসে নকশা জমা দেওয়ার প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। ৫৭টি সেরা নকশার মধ্য থেকে স্থপতি সৈয়দ মইনুল হোসেনের নকশাকে নির্বাচিত করা হয়। ১৯৮২ সালের কিছু পর স্মৃতিসৌধের মূল কাঠামো, কৃত্রিম লেক এবং উদ্যান তৈরির কাজ শেষ হয়।
কংক্রিট দ্বারা নির্মিত সৌধের মূলকাঠামো সাত জোড়া ত্রিভূজাকৃতির দেয়াল নিয়ে গঠিত। দেয়ালগুলো ছোট থেকে ধীরে ধীরে উঁচু হয়ে উপরে উঠে গেছে। মাঝখানের দেয়ালটি দৈর্ঘ্যে সবচেয়ে ছোট কিন্তু উচ্চতায় সবচেয়ে বড়। এর উচ্চতা ১৫০ ফুট। এই সাতজোড়া দেয়াল স্বাধীনতা আন্দোলনের সাতটি প্রধান পর্যায়কে নির্দেশ করে। প্রথমটি দ্বারা ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন, তারপর যথাক্রমে ১৯৫৪-এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৫৬-এর শাসনতন্ত্র আন্দোলন, ১৯৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬-এর ছয় দফা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান এবং সর্বোচ্চ উঁচু স্তম্ভটি দ্বারা ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের বিজয়কে বোঝানো হয়েছে। এই স্মৃতিসৌধের বৈশিষ্ট্য হলো এক এক দিক থেকে এক এক রকম আকৃতির মনে হয়। স্থপতি সৈয়দ মইনুল হোসেন সৌধের মূল কাঠামোটি কংক্রিটের এবং কমপ্লেক্সের অন্যান্য স্থাপনা লাল ইট দিয়ে তৈরি করেন। এর দ্বারা রক্তের লাল জমিনে স্বাধীনতার স্বতন্ত্র উন্মেষ নির্দেশ করা হয়েছে।
জাতীয় স্মৃতিসৌধের মূল কাঠামোর সামনেই রয়েছে একটি জলাশয়। এখানে প্রতিফলিত হয় জাতীয় স্মৃতিসৌধের মূল কাঠামো এবং জাতীয় পতাকা। এই জলাশয়ে ফুটে আছে বাংলাদেশের জাতীয় ফুল শাপলা। এটি শুধু স্মৃতিসৌধ নয়। এটি একটি পূর্ণাঙ্গ কমপ্লেক্স। এখানে রয়েছে আকর্ষণীয় প্রশস্থ প্রবেশ পথ, গাড়ি পার্কিং এর সুব্যবস্থা। প্রবেশ পথের দু’পাশে নানা জাতের ফুলগাছ, পায়ে হাঁটার রাস্তা, উন্মুক্ত মঞ্চ, সেতু, ফুলের বাগান, অভ্যর্থনা কেন্দ্র ও দুইটি হেলিপ্যাড, মসজিদ, রেস্তোরা এবং একটি মনোরম সবুজ–শ্যামল বনানী। এ বনানীতে দেখা যায় নানা জাতের ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছের সমাহার। আধুনিক স্থাপত্য শৈলির এক অপূর্ব নিদর্শন এ স্মৃতিসৌধ দেখার জন্য সারা বছর সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের ভিড় লেগে থাকে। বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবসসহ বিশেষ জাতীয় দিবসে এখানে লাখো জনতার ঢল নামে। স্বাধীনতা অর্জনে প্রতিটি রক্তের কণিকায় বাংলার অটুট সাহসী মুক্তিযুদ্ধের সৈনিক হয়ে যারা এ দেশের স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছে সেই সব অমর শহীদদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।










